একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচনী আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের বিপক্ষে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলটি ১৮ অক্টোবর নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে সংলাপে এই অবস্থানের কথা জানাবে।
এ ছাড়া সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে থাকা এবং সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা না দেওয়া—এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেবে আওয়ামী লীগ।
আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ইসির সঙ্গে সংলাপ সামনে রেখে দলের জ্যেষ্ঠ কয়েকজন নেতা দুই দফা বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠকে ইসির সঙ্গে সংলাপে যেসব প্রস্তাব দেওয়া হবে, সেগুলোর খসড়া তৈরি করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের একজন দায়িত্বশীল নেতা প্রথম আলোকে বলেন, ২০০৮ সালে সীমানা নিয়ে আওয়ামী লীগ বিপুল বিজয় পেয়েছে। তা ভেঙে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে আওয়ামী লীগ।
এদিকে সীমানা পুনর্নির্ধারণের লক্ষ্যে সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন একটি আইনের খসড়া করেছে। এতে জনসংখ্যা, ভোটারসংখ্যা ও মোট আয়তনের সমন্বয়ের মাধ্যমে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের পরিকল্পনার কথা বলেছে ইসি।
ইসি সূত্র জানায়, ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করার ফলে ১৩৩টি আসন ব্যাপক ভাঙাগড়ায় পড়ে যায়। ৯টি জেলার একটি করে আসন কমে যায়।
এদিকে বিএনপিসহ ২০-দলীয় জোটের অন্য দলগুলো সীমানা পুনর্নির্ধারণের পক্ষে। বিএনপি মনে করে, ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে করা সীমানা পুনর্নির্ধারণের ফলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার পক্ষে। গত ১৮ জুন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল সিইসির সঙ্গে দেখা করে ২০০৮ সালের আগের সীমানায় ফিরে যাওয়ার দাবি করে।
তবে আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার জন্য টুকটাক পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু ২০০৮ সালের আগের অবস্থায় যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এটা আওয়ামী লীগ হতে দেবে না।
আওয়ামী লীগের কৌশল তৈরির সঙ্গে যুক্ত একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আইন অনুসারে আদমশুমারির এক বছরের মধ্যে সীমানা পুনর্নির্ধারণের নিয়ম। তা সম্ভব না হলে পরবর্তী নির্বাচনের পরের বছর করতে হয়। এই বিবেচনায় আগামী নির্বাচনের আগে সীমানা পুনর্নির্ধারণের সুযোগ নেই। আর এখন সীমানা পুনর্নির্ধারণ করতে গেলে অনেক এলাকায় আসন এলোমেলো হয়ে যাবে।
ইসির সংলাপের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গত বুধবার সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগের ধানমন্ডি কার্যালয়ে এইচ টি ইমামের নেতৃত্বে সর্বশেষ বৈঠক হয়। এতে দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী ও আব্দুর রাজ্জাক, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মসিউর রহমান, রাশিদুল আলমসহ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এরপর গতকাল বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগের ধানমন্ডি কার্যালয়ে ক্ষমতাসীনদের জোট ১৪ দলের বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে ইসির সঙ্গে সংলাপে সব শরিকের অভিন্ন অবস্থান তুলে ধরার সিদ্ধান্ত হয়।
সংলাপে প্রস্তাবের খসড়া তৈরি এবং এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত তিনজন নেতার সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। তাঁরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সীমানা পুনর্নির্ধারণের বিরোধিতা ছাড়াও আওয়ামী লীগ মোটা দাগে আরও কিছু বক্তব্য তুলে ধরবে। তার মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন সরকার হবে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনই নির্বাচন সম্পন্ন করবে। ইসি চাইলে সেনাবাহিনীকে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে, তবে সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া যাবে না। এমনকি গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সেনাবাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না।
আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, এর বাইরে আরপিও, ইভিএম পদ্ধতি চালুসহ বেশ কিছু বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেবে আওয়ামী লীগ। দলের আলোচনায় ভোটের দিন পর্যবেক্ষকদের আচরণ, সব প্রার্থীর জন্য একক সভাস্থল নির্ধারণ, একক পোস্টার চালু করাসহ কয়েকটি বিষয় নিয়েও আওয়ামী লীগ নিজেরা আলোচনা করছে।
আগামীকাল ৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর তাঁর নেতৃত্বে আরও বৈঠক হবে। এতে দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা উপস্থিত থাকবেন। এরপর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক ডেকে ইসির সঙ্গে সংলাপের কৌশল ও প্রতিনিধিদল ঠিক করা হতে পারে।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে গত ২৪ আগস্ট থেকে সংলাপ শুরু করেছে ইসি। এ পর্যন্ত ২৩টি দলের সঙ্গে আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে। ১৯ অক্টোবর এই সংলাপ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
সংলাপের বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রাজ্জাক
প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনায় বসার জন্য তাঁদের প্রস্তুতি চলছে। দলীয় প্রধান দেশে ফিরলে এগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। নির্বাচন কমিশনের আইন ও বিধিবিধানে কী আছে, কী করা দরকার, এগুলো পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে।
আরপিও পরিবর্তন করে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সময়সীমা কমানো উচিত কি না—এমন একটা আলোচনাও আছে ক্ষমতাসীনদের মধ্যে। এখন সরকারি চাকরি থেকে অবসরের তিন বছরের মধ্যে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারার বিধান আছে। তবে এই বিষয়ে আরপিও পরিবর্তন না করার পক্ষেই মত বেশি।
সেনাবাহিনীর প্রশ্নে সরকারি দল আওয়ামী লীগের মত হচ্ছে, কমিশন চাইলে অতীতের মতো সেনাবাহিনী নামাতে পারে। সেনাবাহিনীর ভূমিকা বর্তমান আরপিও ও ফৌজদারি কার্যবিধিতে সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে। এর বাইরে গিয়ে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার যুক্তিই নেই এবং দলটি এর বিপক্ষে।
নির্বাচনে পর্যবেক্ষকদের বিষয়ে আওয়ামী লীগের কিছু ভাবনা আছে। দলটির নেতাদের আলোচনায় এসেছে, সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের একটা অংশ নির্দিষ্ট কিছু কেন্দ্রে অবস্থান নিয়ে ভিড় তৈরি করে। ফলে ভোট গ্রহণে সমস্যা হয়। আবার কিছু কেন্দ্রে পর্যবেক্ষকেরা যান না। তাই নির্বাচন কমিশন যাতে পর্যবেক্ষকদের সব কেন্দ্রে অবস্থান নিশ্চিত করে, এমন প্রস্তাব দিতে পারে আওয়ামী লীগ।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম প্রথম আলোকে বলেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই হবেন নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান—এটা আওয়ামী লীগের মূল অবস্থান। এ ব্যাপারে ১৪ দলও একমত। এর বাইরে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করতে এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে আওয়ামী লীগ কিছু প্রস্তাব তুলে ধরবে। নির্বাচন পরিচালনা কমিটি এসব বিষয়ে কাজ করছে।